রাজনৈতিক ভবিষ্যতে ‘অপরিহার্য শক্তি’ হিসেবে জামায়াতকে তুলে ধরার চেষ্টা: জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমানের বহুমুখী তৎপরতা
২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে জামায়াত-ই-ইসলামি বাংলাদেশের আমির শফিকুর রহমান একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।
এই বৈঠকগুলো একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে দাবি শীর্ষ গোয়েন্দা সূত্রের।
উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে একটি অপরিহার্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরা।
এই বার্তা দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জানুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহে শফিকুর রহমান অন্তত ছয় থেকে সাতটি বৈঠক করেন। আগের মাসগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি। বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা কূটনৈতিক মিশন। এর মধ্যে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি ও চীন। পাশাপাশি পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মহলের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। সূত্র অনুযায়ী, এই সময়েই দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়ে যায়। নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনাও ঘটে।
৭ জানুয়ারি শফিকুর রহমান ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ইউরোপীয় এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিসের পাউলা পামপালোনি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। ১২ জানুয়ারি তিনি চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৩ জানুয়ারি জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লট্জের সঙ্গে একটি প্রাতরাশ বৈঠক হয়। এর আগে, ১ জানুয়ারি তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৬ জানুয়ারি তাঁর সাক্ষাৎ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সঙ্গে।
গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে সহিংসতার প্রকৃতি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। এগুলোকে পরিকল্পিত হামলা নয়, ‘স্বতঃস্ফূর্ত অস্থিরতা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জামায়াতকে একটি স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলে। শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বাংলাদেশকে অস্থির করছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মহলের সহনশীলতা আদায়ের চেষ্টা করেন। লক্ষ্য ছিল জামায়াতকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি গোপন বৈঠকও নজরে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার। তিনি উগ্রপন্থায় প্রভাবিত যুবগোষ্ঠীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন বলে অভিযোগ। সেখানে ভারতকে বাংলাদেশের ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠার প্রধান বাধা হিসেবে তুলে ধরা হয়। সূত্র জানায়, এসব যুবগোষ্ঠী পরে রাজপথে সহিংসতায় নামার অঙ্গীকার করে। তাদের লক্ষ্য ছিল তথাকথিত ‘দেশ শুদ্ধিকরণ’।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শফিকুর রহমান অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে ভোটার সংগঠিত করা। এতে জামায়াতের নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা সৃষ্টির সক্ষমতা আরও জোরদার হয়েছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জামায়াত-ই-ইসলামি বর্তমানে তিনটি ফ্রন্টে কাজ করছে।
প্রথমত, সংগঠিত রাজপথের সহিংসতা।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলে বৈধতা আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা।
সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক অস্থিরতার লক্ষ্য তাৎক্ষণিক সরকার পরিবর্তন নয়।
এর মূল উদ্দেশ্য জামায়াতের ‘স্ট্রিট পাওয়ার’ প্রদর্শন।
বার্তাটি স্পষ্ট—
বর্জন মানেই অস্থিরতা, আর অন্তর্ভুক্তি মানেই নিয়ন্ত্রণ।








