মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর দানবদের রহস্য
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে এক অদ্ভুত “দানব”-এর সন্ধান পান। কন্যা (Virgo) নক্ষত্রমণ্ডলের একটি বস্তু থেকে প্রবল রেডিও তরঙ্গ নির্গত হচ্ছিল, কিন্তু দৃশ্যমান আলোতে তার কোনো অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছিল না। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর গবেষকেরা সেখানে একটি ক্ষীণ নীল “তারার” মতো বস্তু দেখতে পান। পরে জানা যায়, সেটি আদৌ কোনো তারা নয়।
এই রহস্যময় বস্তুটির নাম 3C 273—একটি কোয়াসার (Quasar), যা পৃথিবী থেকে প্রায় ২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এত দূর থেকেও দৃশ্যমান হওয়ার অর্থ, বস্তুটি ভয়ংকরভাবে উজ্জ্বল।
কোয়াসার ও সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর
বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, 3C 273-এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর, যার ভর আমাদের সূর্যের তুলনায় প্রায় ৯০ কোটি গুণ বেশি। এই বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে থাকা পদার্থ প্রচণ্ড গতিতে ঘুরে তীব্র শক্তি ও আলো উৎপন্ন করে—এ কারণেই কোয়াসার এত উজ্জ্বল।
১৯৮০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করতে শুরু করেন যে, প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ আধুনিক পর্যবেক্ষণে এখন এটি নিশ্চিত হয়েছে। ফলে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে এমন কৃষ্ণগহ্বরের সংখ্যা হতে পারে হাজার বিলিয়নের কাছাকাছি।
কৃষ্ণগহ্বর কত বড় হতে পারে?
অনেক সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের চেয়ে কয়েকশো কোটি গুণ বেশি। কিছু ক্ষেত্রে এই ভর একটি ছোট গ্যালাক্সির সমান। পর্যবেক্ষণ ও তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর সম্ভবত ৫০ বিলিয়ন সূর্যের ভরের কাছাকাছি।
তাত্ত্বিকভাবে কৃষ্ণগহ্বর অনন্তকাল বেড়ে উঠতে পারে, কারণ এটি আশপাশের সবকিছু গ্রাস করে। কিন্তু বাস্তবে একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে—এডিংটন সীমা (Eddington Limit)। বেশি পদার্থ পড়তে থাকলে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অ্যাক্রিশন ডিস্ক অতিরিক্ত গরম হয়ে নতুন পদার্থকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক সীমা তৈরি হয়।
২০১৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, আদর্শ পরিস্থিতিতে কৃষ্ণগহ্বরের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে ২৭০ বিলিয়ন সূর্যের ভর। তবে বাস্তবে এমন পরিস্থিতি খুবই বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সীমা ৫০ বিলিয়ন সূর্যের ভর।
কৃষ্ণগহ্বর কি বিপজ্জনক?
আকারে বিশাল হলেও কৃষ্ণগহ্বর আশপাশে না থাকলে বিপজ্জনক নয়। আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা Sagittarius A* নামের কৃষ্ণগহ্বরটির ভর প্রায় ৪০ লক্ষ সূর্যের সমান এবং এটি পৃথিবী থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে—তাই আমাদের কোনো বিপদ নেই।
এমনকি সূর্যের জায়গায় যদি হঠাৎ সমান ভরের একটি কৃষ্ণগহ্বর বসানো হয়, পৃথিবী তার কক্ষপথেই ঘুরবে। সমস্যা হবে আলো ও তাপের অভাবে, টান বা আকর্ষণের কারণে নয়।
কসমিক ক্যানিবালিজম
কৃষ্ণগহ্বর বড় হওয়ার আরেকটি উপায় হলো গ্যালাক্সির সংঘর্ষ। দুটি গ্যালাক্সি মিলিত হলে তাদের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরও একীভূত হতে পারে—একে বলা হয় কসমিক ক্যানিবালিজম। তবে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল, তাই এটি সর্বোচ্চ সীমা খুব বেশি বাড়ায় না।
অজানার সম্ভাবনা
এখন পর্যন্ত আমরা যে কৃষ্ণগহ্বরগুলো শনাক্ত করেছি, তাদের ভর তাত্ত্বিক সীমার কাছাকাছি। তবু মহাবিশ্ব আমাদের বারবার চমকে দেয়। কোথাও হয়তো আরও বিশাল কোনো কৃষ্ণগহ্বর লুকিয়ে আছে। যদি তা পাওয়া যায়, বিজ্ঞানীদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে—এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য।
মহাবিশ্বের মতোই, আমাদের জ্ঞানও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে—কোনো সীমা ছাড়াই।








